Sunday, September 12, 2021

গাড়ীর নাম মাহাত্ম

 গাড়ীর নাম মাহাত্ম

যেমন আপনার নামই আপনার পরিচয়, তেমনি গাড়ীর নম্বর প্লেটও তার নাম, তার পরিচয় -- তার রেজিস্ট্রেশন বই হলো তার আধারকার্ড।
পশ্চিম বাংলার নম্বর প্লেট নিয়ে অন্য রাজ্যে ঢুকুন, ট্রাফিক পুলিশ এমন ভাবে আপনাকে দেখবে যেন আপনি গাড়ী চুরি করে পালাছেন ভিনদেশে। গুজরাটের ভাড়া ট্যাক্সি নিয়ে জয়পুর গেছিলাম, ট্রাফিক পুলিশ ড্রাইভারের সব কাজগপত্র ঘেঁটে কিছু গোঁজামিল না পেয়েও খসখস করে চালান খাতায় এক হাজার টাকার জরিমানা লিখে দিলো। কি কারণ ? ভাড়ার ট্যাক্সি ড্রাইভার কেন তাদের জন্য নির্দিষ্টকরা পোশাক ( সেটা কি জানি না) পড়েনি, সেই জন্য, মানে, সেই বাঘ-ছাগলের গল্প -- তুই জল ঘোলা করিসনি তো তোর বাপ বা ঠাকুরদা করেছে, তোকে আমি খাবই। বিভিন্ন রাজ্যে পরিবহন ও ট্রাফিকের আলাদা আলাদা কানুন, সবাই কি তার খোঁজ রাখে? সাধারণে জরুরী কাগজপত্র (রেজিস্ট্রেশন, বীমা, PUC, রোড ট্যাক্স আর ড্রাইভিং লাইসেন্স) নিজের সাথেই রাখে, ভিনরাজ্যে গেলে বিশেষতঃ। কিন্তু হাজার কানুনে যে আপনি বাঁধা, সেটা জানেন কি ?
আহমেদাবাদে ঢোকার মুখেই পুলিশ চৌকি, জাতীয়সড়কের বাঁকে ওতপেতে বসে আছে পুলিশ, অন্য জেলার বা রাজ্যের নম্বর দেখলে ইশারাতে রাস্তার পাশে ডেকে নেবে, নানা কানুনে আপনাকে পরখ করবে, যদি ট্রাক হয় তবে কপালে আরও দুঃক্ষ, পুরা ট্রাক তল্লাশি করবে -- কিছু না পেয়ে নিখরচায় যেতে দেবে, এমনটা খুব কম হয়।
শুনেছিলাম, উদয়পুরে নাকি গুজরাটের গাড়িকে পাশ দিয়ে এগিয়ে যাবার পথ ছাড়ে না, পরে নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছিলাম, যা রটে তার কিছুটা তো বটে!
রক্তের সম্পর্ক বড় সম্পর্ক। ভিনরাজ্যে রাস্তায় আপনার গাড়ীর কোনো যান্ত্রিক বিভ্রাটে আপনার রাজ্যের কোনো গাড়ীর চালক দেখলে, তার থেকে সহায়তা পাবেন, কিছু পেট্রলের প্রয়োজনে, গাড়ীর টায়ার পাল্টাতে বা ওই জাতীয় কিছু প্রয়োজনে।
"নামে কি আসে যায়" যে বলেছিলো, তার গাড়ি ছিলোনা, তার কথা বাদ দিন, গাড়ীর বেলায় সেই কথা খাটে না।

Tuesday, August 24, 2021

কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (৩)

 

কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (৩)

একবার উদয়পুরে ঠাইঁ নিয়েছেন তো একটা বড় সুবিধা হলো, আসেপাশের ভ্রমণের জায়গাগুলো দেখার জন্য সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা যায় বিনা ক্লান্তিতে। যেমন একশো কিলোমিটারের সামান্য বেশি দূরত্বের চিত্তোরগড়, হাইওয়ে এতই মসৃন ও বাধাহীন যে মনে হবে কোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে। চিত্তোর যাবার আগে তার ব্যাপারে একটু পড়াশোনা করে নিলে ভালো হয়, যদিও দেখবেন স্থানীয় গাইডরা মাছির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। অষ্টম শতাব্দীর এই রাজপূত রাজধানী ভারতের সব চাইতে বড় দুর্গ ছিল সারা চিত্তোরগড় আপনি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে পারবেন, এক রাস্তায় প্রবেশ ও অন্য রাস্তায় নির্গমন। দেখুন মীরার মহল ও মন্দির, জহরব্রতের জায়গা, নানান মন্দির, পদ্মিনীর মহল ও জলাশয় (এবার গিয়ে দেখলাম সেই আয়নাটা গায়েব, যাতে পদ্মিনীর প্রতিচ্ছবি দেখে আলাউদ্দীন এক নম্বর কমান্ডমেন্ট ভঙ্গ করেছিল) - - ফেরার পথে অবশ্যই কিছুটা সময় দেবেন "সুরজপোল"-এ,  আক্রমণকারী দিল্লীর মালিকেরা(আফগান ও মুঘল) এই পথেই ঢুকতো দুর্গ জয় করার জন্য, প্রতি অধ্যায়ের শেষ হতো জহরব্রত দিয়ে।

উদয়পুর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে আছে "রাজসামান্দ লেক". শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার এগোলেই পড়বে এক অভয়ারণ্য, ঘন জঙ্গলে দুপাশ ঢাকা, আড়াল থেকে তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে পাখার ঝাপ্টা মেরে পালিয়ে গেলো নাম না জানা পাখী, কোথাও জলাশয়ের পাড়ে এক চক্ষু বুজে দাঁড়িয়ে আছে ঢ্যাঙা এক ভিনদেশী বক, নির্জন নিঃসঙ্গ আলোআঁধারী পরিবেশ। কিছুক্ষন পরেই আসবে "রাজসামান্দ লেক", পাহাড়ের কোলে ছড়ানো --  এক সুন্দর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে যাকে ছবির মতো দেখায়। সতেরোশ শতকে মেবারের রানা রাজসিং নির্মাণ করেছিলেন এই লেক। সুন্দর শ্বেতপাথরে বাঁধানো ঘাটে বসে দেখুন চারপাশের ছবি, কাঁচের মতো টলটল পরিষ্কার জলে দেখুন ভেসে যাওয়া মেঘের ছায়া আর থেকে থেকে জল থেকে ছলাঙ মারা রুপালী মাছেদের হুটোপুটি।

হালদিঘাট যুদ্ধের পরেও দুই দশক বেঁচে ছিলেন প্রতাপ, নতুন রাজধানী বানিয়েছিলেন উদয়পুর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে, চাভান্ড গ্রামে, রাজসামান্দ থেকে ৩০ কিলোমিটারের মতো দূরে, সরু রাস্তা ধরে ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ির রাস্তা। চাভান্ড থেকে দুই কিলোমিটার দূরে, বাডোলি গ্রামে, এক নদীর পাড়ে প্রতাপের শেষকৃত্য করা হয়। লোকালয় থেকে অনেক দূরে থাকা এই সমাধিতে কিছুক্ষন সময় কাটান, সেই পরাক্রমী রাজপুতের স্মরণে। এই জায়গা সাধারণ পর্যটকদের জানার বাইরে, কোনোদিন উদয়পুর আসলে অবশ্যই খোঁজ নেবেন।

সাতদিনের প্রোগ্রাম শেষ, ঘরে ফেরার সময় এলো -- সকালে হোটেলে প্রাতঃরাশ সেরে রওনা দেওয়া আহমেদাবাদের রাষ্ট্রীয় সড়ক মার্গে, রাস্তায় কেনা হলো বার্গার ব্রেড চীজ বিস্কুট ইত্যাদি, সাথে আছে ফ্লাস্কের গরম জল আর টি-ব্যাগ। অনেক ভালো জায়গা পাবেন রাস্তায় জিরোবার জন্য, এখন তো আর তাড়া নেই.ঘরে ফেরার। গান্ধীনগর ঢুকতেই পড়ন্ত বিকেলে, আর ২০ কিলোমিটার পরেই আহমেদাবাদ।

মাথায় এখন আছে হয় জয়সলমীর (৩ দিন যথেষ্ট) নয়তো ধোলাভিরা (হরাপ্পা সংস্কৃতির অবশেষ, বিরাট বৃষ্টির জল ধরে রাখা কুয়া ইত্যাদি) ছুঁয়ে কচ্ছ সীমান্ত আদি ঘুরে আসা (৪/৫ দিন ধরে রাখুন) -- নয়তো ইন্দোর-বিদিশা-সাগর- এলাহাবাদ-হাজারীবাগ-কলকাতা-আহমেদাবাদের (এটা প্রায় ২২০০ কিলোমিটার, সব মিলিয়ে দিন কুড়ির ভ্রমণ।


Wednesday, August 18, 2021

কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (২)

 কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (২)

ওই যে প্রতি সপ্তাহের শেষে দলে দলে গাড়ি করে সবাই গুজরাট সীমান্ত পেরিয়ে রাজস্থানের আবু পাহাড় বা উদয়পুরের রাস্তায় ছুটে চলেছে, তারা যে সবাই ধর্মপিপাসু বা সৌন্দর্যপিপাসু, তা মনে করার কারণ নেই।
যদিও উদয়পুরের কাছে হিন্দুদের শ্রীনাথজি ও আবু পাহাড়ে দিলবারা জৈনমন্দির আছে --(আমেদাবাদ থেকে দুটোই প্রায় ২৩০ কিলোমিটার) -- কিন্তু বেশিরভাগের পিপাসাটা অন্যত্র, মদিরার টান। গুজরাটে মদ্যপান নিষিদ্ধ (হেলথ পার্মিট ব্যবস্থা আছে, কিন্ত প্রক্রিয়ার জটিলতার জন্য মদিরার গুণগ্রাহীরা সে পথে কম যায়)।
আমেদাবাদ থেকে ১৩০ কিলোমিটার গেলেই শ্যামলাজী, পেরোলেই রাজস্থান সীমান্ত (আবু পাহাড়ে যেতে গেলে তার ৫০ কিলোমিটার আগেই হিম্মতনগর থেকে অন্য রাস্তা)-- সীমান্ত পেরোলেই শুরু নানান মানের মদের দোকান, বার, ধাবা, হোটেল -- যার যেমন সাশ্রয়।
সুতরাং, দল বানাও, চলো শ্যামলাজী সীমান্ত, সকালে পৌঁছিয়ে আকণ্ঠ পান করে, পেট ভরে নিষিদ্ধ ভোজন করে (মানে, চিকেন মাটন) ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এসো সন্ধ্যায়। বলা বাহুল্য, সকালে তারুণ্যে ডগমগানো উচ্ছল প্রাণগুলো সন্ধ্যায় ঝিমানো লতার মতো একে অন্যর ঘাড়ে ঝুঁকে পড়া অবস্থায় ফিরে আসে।

আর যদি সপ্তাহের শেষ দিনগুলি কাটাতে চান, তবে বেরিয়ে পড়ুন আবু পাহাড়, দেখে আসুন আরাবল্লীর সব চাইতে উঁচু শৃঙ্গ "গুরুশিখর" (১৭২২ মিটার - - ওই পর্যন্ত আপনার গাড়ি যাবে) -- পাহাড় বনপাদপের শেষে, ছড়ানো সুদূর রুক্ষ প্রান্তরে, দেখবেন দূরে সুতোর মতো বইছে বনাস নদী, নিচের ঘন জঙ্গলে নানান পাখির কলতান, নিচে যাওয়ার জঙ্গলের রাস্তা পাথর দিয়ে বাঁধানো, ভালুক চিতার ভয়ে এক কেউ যায় না নিচের এক মন্দিরে -- কোথাও না গিয়ে প্রাণ ভরে নির্মল বাতাস নিন, দেখুন অরণ্যের বাধনহারা বিস্তার -- শিখরে ভালো বসার জায়গা আছে। নাক্কি লেক-এ বোটে চড়ে সময় কাটাতেও পারেন। পারলে ঘুরে আসুন এগারো শতকের বিচিত্র খোদাইয়ের কারুকাজে সমৃদ্ধ, পাঁচ তীর্থঙ্করের উদ্দেশ্যে নিবেদিত, দিলবারা মন্দির।
তবে এই করোনার উৎপাতে সাত দিনের জন্য বেরিয়ে পড়েছিলাম উদয়পুর। একটা হেরিটেজ হোটেলে আগেই বুকিং ছিল, একদম ফাঁকা, পরিচ্ছন্নতায় কোনোই ত্রুটি নেই, সব উত্তম বাবস্থা।
এর আগেও অনেকবার গিয়েছি উদয়পুর, তবে পরিবারের সবাই একসাথে এই প্রথম। আগেই ঠিক করেছিলাম, ভীড়ের মধ্যে শহরে ঘুরবো না। একদিন গেলাম হলদিঘাট, আরাবল্লীর মালভূমিতে সেই মুঘল-রাজপুত লড়াইয়ের জায়গা (আসলে মুঘলদের হিন্দু সেনাপতি বনাম চিতোরের হিন্দু রানা প্রতাপের লড়াই, same side) -- দুইপাশে সামান্য উচ্চতার হলুদ রঙের বড় টিলা, মাঝখান দিয়ে রাস্তা, লোকে সেই হলুদ মাটির এক টুকরা নিয়ে ফেরে স্মারক হিসেবে। উদয়পুর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটারের দূরত্ব, রাস্তা ভালো মন্দে মেশানো, কাজ চলছে।

হলদিঘাট পোঁছানোর ১৫ কিলোমিটার আগে চলে গেছে কুম্বলগড় যাবার রাস্তা (উদয়পুর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে)-- সেই রাণাপ্রতাপের জন্ম, ধাত্রী পান্না ইত্যাদি লোকগাথার জায়গা। রাস্তা কিন্তু বেশ ফাঁকা, দুপাশে পাবেন খোলা মালভূমির প্রান্তর, সে সব পেরিয়ে পাবেন জঙ্গলের/পাহাড়ের শুরু। সর্পিল পাহাড়ী পথে আসবে সরু বানাস নদী, পাহাড় থেকে নেমে আসছে হুল্লোড় করে, যেমন স্কুল ফেরত প্রাইমারি স্কুলের কচিরা করে -- বর্ষাকালে সেই ছোট নদীর জল যদি বাঁধানো পুলের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, আপনার গাড়ীর টায়ার ধুয়ে দিয়ে, তবে নেমে পড়ুন গাড়ি থেকে, ঠান্ডা প্রবাহে হাত-পা ভিজিয়ে, চোখ-মুখ-মাথায় জলের ছিঁটে দিয়ে, যাত্রার ক্লান্তি দূর করে নিন।
পশ্চিম আরাবল্লীর ওপর নির্মিত, কুম্বালগড়ের দুর্গ রানাকুম্ভ সেই ১৫ শতকে বানিয়েছিল, তাকে ঘিরে রেখেছে ৩৬০০ ফুট উঁচু, ৩৮ কিলোমিটার লম্বা বিশাল এক প্রাচীর, চীনের প্রাচীরের পরেই যার নাম, তার ওপর দিয়ে কম করে আটটা ঘোড়া একসাথে ছুটতে পারে, এমন চওড়া। বলা হয়, গড় বানানো হয়েছিল চিতোরের রানাদের নির্ভয় আশ্রয়ের জন্য, মুঘলদের নাগালের বাইরে। আপনার গাড়ি রাখতে হবে গড়ের বিশাল দরজার বাইরে, বরাতে থাকলে ভালো জায়গা পেয়ে যাবেন। দুর্গের ওপরে পোঁছানো বেশ পরিশ্রমের ব্যাপার, হাঁটুতে চলার অসুবিধা থাকলে সামান্য ওপরে কোনো জায়গায় বসে চারদিকে ছড়ানো মন্দির, বিশাল প্রাচীর আর ধূসর আরাবল্লী দেখুন। ওপরে গেলে দেখবেন সেনাদের ব্যারাক, কামান দাগার জায়গা, জীর্ণ পরিত্যক্ত মহলের অবশেষ, আপৎকালীন প্রস্থানের সিঁড়ি আর সেই ঘর, যেখানে প্রতাপ ভূমিষ্ট হয়েছিল বলা হয়।

Sunday, August 8, 2021

কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (১)

 

কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (১)

(Internet-এ এই বিষয়ে অনেক ছবি ও ভিডিও থাকায়, এই লেখাতে আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহ পরিহার করেছি -- অনেক বেশি ভ্রমণ বিবরণও পাবেন সার্চ করলে)

COVID -এর বাধানিষেধ অসহ্য হলেই মেয়ে আর নাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম আরাবল্লীর আশ্রয়ে। একবার না, একাধিকবার। আমেদাবাদ থেকে আরবল্লী আপনি ৭-৮ ঘন্টায়  ছুঁয়ে ফিরে আসতে পারেন (শ্যামলাজী, পোলো'র জঙ্গল বা তরঙ্গা পাহাড় ), কমবেশি ১৫০ কিলোমিটার।  সময় থাকলে সীমানা পেরিয়ে রাজস্থানে দিনও কাটাতে পারেন (আবু পাহাড়, উদয়পুর, কুম্বলগড়, হালদিঘাটি বা রাজসমুদ্র'লেক), কমবেশী ৩০০ কিলোমিটারের দূরত্ব। গুজরাট ও রাজস্থানের সব রাস্তাই মসৃণ চওড়া, সড়কপথে যাত্রা যন্ত্রণাদায়ক না, রাস্তার পাশে আছে অনেক উত্তম ধাবা, যার খাবার ও স্বচ্ছ পরিবেশ সপরিবারে ভ্রমণের উপযুক্ত।যাতায়াতের অন্য সাধারণ ব্যবস্থা থাকলেও, নির্ঝঞ্ঝাট হয় নিজেদের গাড়ি থাকলে।

সেই হরিয়ানা থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে, দিল্লী রাজস্থান হয়ে, গুজরাটের আবুতে যাত্রা শেষ করেছে আরাবল্লী, হিমালয়ের থেকেও যার বয়েস বেশি। তার কাঁটা ঝোপ ঝাড় জঙ্গলে আশ্রয় দিয়েছে হরপ্পা সভ্যতার বিস্তার, অনেক অনেক বৌদ্ধ গুফায় গুঞ্জিত হয়েছে মানুষ ও জীবের মঙ্গল কামনার প্রার্থনা, হিন্দু ও জৈন মন্দির তো আছেই। তার কোনে কোনে এখনো লুকানো অদেখা অজানা অতীতের অনেক অনাবিষ্কৃত রহস্য, ঘন কাঁটাভরা বাবুলের আঁচলে যা চোখের আড়ালে ঢাকা রয়েছে। এই আরাবল্লী আবার বর্ষার ছোঁয়ায় সবুজে সেজে ওঠে, অতি অপরূপা তখন সে -- তার গা বেয়ে নেমে আসে ছোট বড় বর্ষাতি নদী, পাদদেশের শুষ্ক নিঃস্নেহ ঊষর প্রান্তরে শ্যামলীমা আনতে।

শ্যামলাজীর মন্দির এই মন্দিরে গদাধর বিষ্ণু আনুমানিক হাজার বছর বিরাজমান, মন্দিরের বাইরের দেয়ালের কারুকাজ দেখে অবাক হবেন, এমন সুন্দর। এর পরেই রাজস্থানের চেকপোস্ট, রাস্তা গেছে উদয়পুরের দিকে। সময় থাকলে খোঁজ করুন আশেপাশের প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের -- একটার খোঁজ পেয়েছিলাম, কিন্ত বিবরণে অতি দুর্গম জেনে দেখা হয় নি

পোলো'র জঙ্গল প্রায় এক হাজার বছরের আগে পরিহার বংশের রাজা এখানে তার রাজধানী বানিয়ে ছিলেন, হার্নাভ নদীর পাশে, ৪০০বর্গ কিলোমিটার ছড়ানো এই গুজরাট-রাজস্থান সীমান্তের ঘন জঙ্গলে - - বলা হতো, এখানে মাটিতে সূর্যেরআলো পৌঁছায় না, এমনই ছিল সবুজের আস্তরণ। পরিত্যক্ত এই শহরে আছে খুব সুন্দর প্রাচীন শিব মন্দির, জৈন মন্দির। জঙ্গলে কান পেতে শুনুন হর্নবিল বা বার্বেটের কণ্ঠস্বর, রাত্রে চিতা ভালুক হায়েনা তাদের উপস্থিতি জানায়।

তরঙ্গা পাহাড়। আরাবল্লীর এক বিস্তার এই পাহাড় ভিন প্রদেশের পর্যটকদের কাছে খুব পরিচিত না, বেশখানিটা নির্জন রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয়, তারপরেই সেই কাছে আসার হাতছানি। পাহাড়ী রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল, এক পাস দিয়ে এক ক্ষীণতনু এক স্রোতস্বিনী নিজের তালে নেমে আসছে। উঁটের পিঠের মতো উতরাও-চড়াও পথের শেষে মিলবে জৈনদের এক প্রসিদ্ধ মন্দির। ফিরে যান সমতলে, একটু এগিয়েই পাবেন পুরানো বৌদ্ধ গুফা, সরকারী প্রকল্পে যার সংস্কার চলছে। উঁচুতে পাহাড়ের ওপরে আছে আরও এক বৌদ্ধ সাধনা স্থল, জঙ্গলে ঢেকে গেছে সেখানে পৌঁছানোর পথ

এই হলো পাহাড়ের একপাশের গল্প, গুজরাটের। ও পাশের গল্প করবো পরের বার।

Thursday, October 31, 2019

প্রায় লুপ্ত হওয়া কিছু জীবিকার কথা -- সিঁথী, ১৯৫০-৬৫

প্রায় লুপ্ত হওয়া কিছু জীবিকার কথা -- সিঁথী, ১৯৫০-৬৫


শীতের কোনও রবিবারের ভোরে ছাদে পড়তে বসেছি মাদুর পেতে, কখন খুলনা সাতক্ষীরা বসিরহাট হয়ে সূর্যের আলো পৌঁছাবে সিঁথীতে, সেই আশায় বসেছি বই নিয়ে। চাদরে মাথা মুড়ি দিয়ে সামনে বই খুলে জোরে জোরে পড়ছি (মা বলেছেন, নিচ থেকে যেন পড়ার আওয়াজ পাই) কিন্তু কান রয়েছে নিচের রাস্তায়, রসের বাঁকি যেন এসে ফিরে না যায়। এই ঋতুতে বাঁকি অতি সকালে তার বাঁকের আগে পিছে দুই মাটির কলসী ভরে তাজা খেজুর রস নিয়ে আসবে, তাকে দেখলেই গ্লাস আর পয়সা নিয়ে দৌড়াও, রসের শেষ বিন্দুটি গ্লাস উল্টে খাবার পর ঠোঁটে রসের হালকা ফেনা লেগে থাকবে, সেটা চাটার পরই মন তৃপ্ত হবে।
বিকেল পড়তেই পায়ে ঘুঙুর বেঁধে বুকের সামনে টিনের ডাব্বা ঝুলিয়ে ঘুগনী নিয়ে আসতো একজন, তাকে দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়তো মেয়ে বৌয়েরা, ছোট শালপাতার ডোঙায় দেওয়া টক-ঝাল-নুনের মশলা ছড়ানো সেই গরম ঘুগনী পাতায় বানানো চামচে খেতে খেতে ঘর্মাক্ত তারা কাপড়ের খুঁটে চোখ-নাক মুছতো, বায়না করতো আরও একটু মশলা ছড়ানোর জন্য।
একটু রাত্রি হলে আসতো একজন কুলফী বেচতে, একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো স্ট্যান্ডের ওপর রাখতো মোটা সলতের কুপী আর বড় মাপের কলসীতে বরফের ভেতর থাকতো কুলফী। কুলফীকে টিনের ত্রিকোণ খোলের ভেতর থেকে বের করে, চাকুতে কেটে, তার ওপর মশলা ছড়িয়ে সে কুলফী দেবে ছোট শাল পাতায়, শুনতাম সেই মশলায় নাকি সিদ্ধি মেশানো হতো -- সত্য মিথ্যা জানি না, কেননা ওখানে পাড়ার বড়দের জটলা হতো, ওই পড়ার সময়ে ছোটরা সেখানে থাকতামও না।
দুপুর-বিকেলে আসতো আর একজন, মাথায় একটা বড় আকারের চৌকোণো বাক্স নিয়ে, তার গোল খোপে চোখ রেখে দেখা যাবে রঙীন লন্ডন ব্রীজ, ইফেল টাওয়ার, তাজমহল, লালকেল্লা, কুতুব মীনার আরও কত কি! বাচ্চাদের ভীড়ে ঘেরা থাকতো সেই দুনিয়া দেখানো বাক্স -- কেউ ঝুঁকে, কেউ গোড়ালী উঁচু করে খোপেতে মাথা লাগিয়ে দেখছে সেই বিচিত্র জগত।
সকালের এক প্রাত্যহিক দৃশ্য ছিল দরকারী সরঞ্জাম ভরা একটা কাঠের বাক্স হাতে নিয়ে, কাঁধে একটা ভাঁজকরা চাদর ফেলে, বাঁধা পথে বিশু নাপিতের হনহন করে হেঁটে যাওয়া। তাকে দেখে চায়ের দোকানের কেউ হাঁক দেবে হাত-পায়ের নখ কেটে দেবার জন্য। সময় নষ্ট না করে, জলে নখ ভিজিয়ে অল্প সময়ে বিশু নরুন দিয়ে সুন্দর নখ কেটে দেবে। বাঁধা পারিবারিক গ্রাহক আছে বিশুর, ঘুরে ঘুরে সেসব বাড়িতে গিয়ে ছেলে-বুড়োর চুল-দাড়ি কাটে, পারলৌকিক কাজে বিশুই তাদের ত্রাতা।
বাপঠাকুরের আমলের লাগানো কারোর বাড়ীর নারকেল গাছ এখন প্রতিবছরই কাঁদির ওজনে ঝুঁকে পড়ে -- বাঁধা লোক আছে, সে সময়মতো এসে পায়ে দড়ির ফাঁস লাগিয়ে তরতর করে চড়ে যাবে গাছে, সব নারকেল পেড়ে দেবে। আর খবর দিলেই চলে আসবে সেই লোক যে পুকুরের সব কচুরীপানা উঠিয়ে পুকুর পরিষ্কার করে দেবে -- কচুরীপানার ভেলায় জল বেয়ে সারা পুকুর ঘুরবে আর পাড়ে কচুরীপানার পাহাড় বানাবে। আর যে পুকুরে কলমী হেলেঞ্চা থাকতো, কোথা থেকে বৌ-ঝিয়েরা এসে সে সব তুলে নিয়ে যেত, বাজারে বিক্রির জন্য।
স্ত্রী-বাচ্চা নিয়ে কেউ কেউ আসতো দুপুরের সময়, হাতে থাকতো কাঠের বিরাট রেকাব। খোলা নর্দমার পাঁক তুলে তাতে জল মিশিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছাঁকতো সেই পাঁকের মাটি, সব শেষের তলানীটুকু সযত্নে একটা পাত্রে ভরে রাখতো সোনার দোকানে বেচবে বলে, যদি তাতে সোনার গুঁড়া থাকে! তাদের পেট-পিঠ এক হওয়া শীর্ণকায় দেহ, রুক্ষ চুল, কোটরগত চোখ, মলিন মুখ দেখলে মনে হতো না ভাগ্য কখনো তাদের প্রতি খুব একটা দয়া দেখিয়েছে। তবুও ঘুরে ঘুরে আসতো, যদি কপালে বড় কিছু থাকে।
বর্ষাকালের সন্ধ্যায় ছাতি আর টর্চ নিয়ে আসতো ২-৩ জন, পুকুর পাড়ে, ঝোপে জঙ্গলে খুঁজে বেড়াতো ব্যাঙ, ধরা পড়লে হাতের ব্যাগে পুড়ে রাখতো তাদের, তাদের পায়ের আওয়াজে ছলাঙ মেরে পালাতো সোনা ব্যাঙেরা। বড়রা বলতো, এই সব ব্যাঙ যাবে রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে, নতুন কোনো ওষুধ মানুষকে দেওয়া যাবে কি না তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা এদের ওপরই আগে করা হবে।
দুপুরের নিস্তব্ধতা ভাঙতো আরও কিছু জীবিকাসন্ধানীর আগমন ঘোষণা -- কেউ দাঁতের পোকা বের করে, কেউ কানের ময়লা পরিষ্কার করে, কেউ পিঠে লুধিয়ানার বিছানার চাদর সস্তায় বেচে। কাপড়ের বদলে বাসন বা কাঁচের বাক্সে আলতা-চুড়ী-সিঁদুর-শাঁখা বেচার লোক সে ও আসবে মাসে ২-১ বার।
ঘুরে ঘুরে আরও অনেকে জীবিকা নির্বাহ করতো। ডুগডুগি বাজিয়ে বিবর্ণ জরীর পোশাকে লায়লা-মজনুর মতো সাজিয়ে তার বাঁদর দুটোর নাচ দেখাতে আসতো বাঁদরবালা, বেতের চুবড়িতে বন্ধ করে সাপুড়ে আসতো বীন বাজিয়ে হিসহিস করা সাপ দেখাতে, ভালুকের নাচ দেখতে তো ভিড় উপছে পড়তো, রাস্তার কুকুররা ভালুক দেখে বেয়াদপী করলেই লোক তেড়ে যেত তাদের ভাগাতে।
স্বাধীনতার পর দেশের খাদ্য সমস্যা প্রায়ই ঘুরে ফিরে মাথা চাড়া দিতো -- কন্ট্রোল/রেশন, লেভী বহুউচ্চারিত শব্দ ছিল। খোলা বাজারে চাল খুব কম লোকেই কেনার ক্ষমতা রাখতো, আর তাদের জন্যই পাশের সীমান্তর ফাঁকফোকর দিয়ে আসতো পাচারের চাল। দুপুরের পর কয়লার ধোঁয়া উড়িয়ে বনগাঁ থেকে আসতো একটা লোকাল ট্রেন। ক্যান্টনমেন্ট ছাড়ার পর দমদমের বাঁকে চেইন টানার জন্য গাড়ী থামতেই পীলপীল করে নেমে আসতো লাইনের পর একশ'র বেশী যাত্রী, সব স্ত্রীলোক, বয়েস ২০-৬০, সবার শাড়ীর নিচে পেটে-পিঠে বাঁধা ১৫-২০ কিলোর চালের ব্যাগ। নেমেই রেললাইন ধরে ছুট সিঁথির পাগলাগারদের আন্ডারপাসের দিকে। শরীরের সেই বোঝা টেনে তারপর রাস্তায় নেমে সিঁথী-বরানগরে নির্দিষ্ট দোকান বাজারে পৌঁছে সেই চাল বেচা। ১৫-২০ কিলো চাল বেচে কেউ মুঠোভর্তি টাকা পেত না, বড়জোর বেঁচে থাকার ন্যূনতম সংস্থানগুলো জোগাড় করতে পারতো। রাস্তায় কেউ কেউ তাদের থেকে আবার পুলিশের ভয় দেখিয়ে পয়সাও নিত। মুখের ভাষায় বোঝা যেত সব পূর্ব-পাকিস্তানের মানুষ, ছিন্নমূল বা অনুপ্রবেশকারী। ক্লান্তিতে ছাওয়া শরীর, চোখ-মুখে ভয় সংশয়ের মেঘ, কোনো রকমের শাড়ী দিয়ে শরীর আর চালের ব্যাগ ঢেকে তাদের সেই দৌড় এখনো মনে আছে। জীবনযুদ্ধের সেই লড়াই বড় নির্মম ছিল, বহুদূর ঢাকা বা দিল্লী চরম উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রাখতো সেই জীবিকার সংঘর্ষে পর্যদুস্ত মানুষগুলির থেকে।
সময় পাল্টেছে, আয়ের সাথে পাল্টেছে মানুষের রুচি ও প্রয়োজন, ভোগবাদী অর্থনীতি ও উৎপাদনে মেশিনের ব্যাপক প্রয়োগ অনেক পুরানো জীবিকার ইতিচ্ছেদ করেছে। বিশু হেরেছে সেলুন/স্পা/পার্লার-এর কাছে, ঘুগনীবালা হেরেছে পীজা/চাউমিনের কাছে, আইসক্রিম পার্লার চোখের ঘুম কেড়েছে কুলফীওয়ালার, খেজুরগাছ লোপাট হোক ক্ষতি নেই, কোক/পেপসী আছে, টিভি ভিডিও থাকতে কে দেখবে বাক্সের ভেতরে মুখ ঢুকিয়ে সেই নীরব ছবি? মাঠ পুকুর ঝোপঝাড় নারকেল গাছ মুড়িয়ে খেয়েছে ডেভলপার, সব ব্যাঙ ধরা হয়ে গেছে -- আর খোলা নর্দমা নেই সোনা খোঁজার জন্য, পুকুর বুজিয়ে ফ্লাট হয়েছে, কচুরীপানা-হেলেঞ্চা-কলমী এখন ছবিতে দেখে ছোটরা। মনোরঞ্জনে জন্তু জানোয়ারের ব্যবহারেও এসেছে অনেক বাধানিষেধ। সব জীবিকা যে একেবারে উধাও হয়েছে তা নয় -- কিছু নেই, কিছু গেছে প্রত্যন্ত জনপদে, যেখানে এখনো বৃহৎ বিপণনের থাবা পড়েনি। টিঁকে আছে সময়ের অপেক্ষায়।

Wednesday, October 30, 2019

সিঁথীর শ্রাবনের মেলা

সিঁথীর শ্রাবনের মেলা
সেই ১৯৫৫-৬৫'এর কথা। দুর্গাপূজা কালীপূজার মতোই রথযাত্রা ঝুলন শৈশবে অপেক্ষায় থাকা ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল, যদিও সময় ও সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা মহত্ব খুইয়েছে। জনজীবন তার সারল্য হারিয়েছে, শৈশব বঞ্চিত হয়েছে সামূহিক উৎসবে ভাগিদারীর আনন্দ থেকে।
শ্রাবন আসলেই বসতো মেলা। শহরতলী সিঁথীর নানান পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বসতো সেই মেলা, বরানগরে তেমন কিছু হতো বলে মনে পড়ে না। কালীতলায় আমার মহল্লায়ও একদিনের মেলা বসতো -- বাসস্ট্যান্ড আর শিবনাথ ক্লাবের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় ৫০০ মিটার জুড়ে বসতো সেই শোরগোলের মেলা, দুপুর থেকে সন্ধ্যা গড়ানোর পরেও চলতো বেচাকেনার ভীড়।
কালীতলার বাঙালবাড়ীর ছেলেৱা লিস্ট বানিয়ে ফেলেছে ঝুলনযাত্রার প্রদর্শনী সাজানোর জন্য কি কি জিনিস কিনতে হবে -- পাহাড়ের ওপরে বসবেন মহাদেব ঠাকুর, পেছনের বালতির জল সাইফন হয়ে তাঁর মাথার ওপর থেকে মন্দাকিনী বইবে, জঙ্গলে থাকবে বাঘ সিংহ হরিণ, গাছে বসবে রঙীন পাখী, লাল মাটির পথ বেয়ে সমতলে থাকবে একটা মন্দির আর সরোবর, যার জলে আওয়াজ তুলে ঘুরবে একটা নৌকা (কার্বাইড না কেরোশিনে, মনে নেই) -- কাঁখে কলস নিয়ে জল তুলতে আসবে গ্রামের বৌ, সাথে তার বাছা। কাদা মাটি ইঁট ছেঁড়া কাপড় দিয়ে ১০x ১০-এর মণ্ডপ সাজানো হয়ে গেছে, চাঁদা তোলাও শেষ, এখন শ্রাবনের মেলা থেকে পুতুল কেনার অপেক্ষা।
ঢোকার মুখেই বিক্রী হচ্ছে নানান রঙের বেলুন, ছোট বড় তো আছেই, আছে বেলুনের ঝুমঝুমি, আছে বেলুন দিয়ে বানানো লম্বা লেজের বাঁদর পাখী সাপ, গ্যাস বেলুনের জায়গা ঘিরে কচিদের ভীড়। কাগজে বানানো কুমীর তার লেজ হেলিয়ে, পিঠে ঢেউ তুলে গড়গড় করে চলেছে সুতোর টানে আর ভয়ে দু'পা পিছোচ্ছে বাচ্চারা।
তার সাথে পাল্লা দিয়ে গড়িয়ে চলছে ঢাকের বাদ্যি -- গোল মাটির পাত্রের ওপর চামড়া লাগানো, সুতো-কাঠি দিয়ে এমন কৌশলে বানানো যে চাকা গড়ালেই কাঠি পড়বে চামড়ায় আর বাজবে বাদ্যি।
হটাৎ কোথা থেকে সামনে থেকে আসলো ছোবল তোলা সাপ -- বাঁশের সরু কঞ্চি দিয়ে ভাঁজ করে বানানো ফ্রেম, লেজের দিকে চাপ দিলেই ফ্রেম লম্বা হবে আর সাপের মাথা তেড়ে আসবে অসতর্কের দিকে। এর কাছেই পাবেন কাঠিতে স্প্রিং লাগানো বানর, ওপর থেকে নামছে কেঁপে কেঁপে।
পাশেই বিক্রি হচ্ছে সেই জলে চলা নৌকা, সাথে পাবেন এমন এক টিনের ব্যাঙ যার পেট টিপলেই আওয়াজ বেরোবে। এই আওয়াজ করা ব্যাঙ একবার নৈনান পাড়ার সহপাঠী শ্রীমান স্বরাজ সাহা স্কুলে এনে খুব বকুনি খেয়ে ছিল।
সব আওয়াজ ছাপিয়ে এর মাঝে চীৎকার কেঁদে উঠলো এক বাচ্চা -- গেলো গেলো রব শেষ না হতেই তার হাতের গ্যাস বেলুন আকাশপাড়ি দিয়েছে দমদম রেল লাইনের দিকে, বাচ্চাকে থামাতে আবার উল্টোমুখী হলো তার মা-বাবা, সেই গ্যাস বেলুনের জায়গায়। এক কান্না না থামতেই আর এক কান্না -- কাঠি থেকে আধখানা খসে পড়েছে এক খুকুর হাতের কমলা রঙের আইসক্রিম, ফের দৌড়াও সেই "ম্যাগনোলিয়া" ঠেলার কাছে, কেনো আর একটা। ততক্ষনে তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে "বুড়ীর মাথার পাকাচুল" আর আঠার মতো এক ক্যান্ডি, বড় বাঁশের ওপরে লাগানো একটা কি যেন মাখা থেকে ছোট বাঁশের স্টিকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নানান ফুলের আকার করে বিক্রি করছে -- ললিপপের মতো ওটাকে চেটে চেটে খেতে হয়।
ছাতি খুলে বসেছে একজন মঠ ফুটকরাই সিগাটের-লজেন্স নিয়ে -- ভরসা নেই আকাশের, যদি বৃষ্টিতে চিনির জিনিস নষ্ট হয়ে যায়`! মঠের বাহার দেখো -- একটা বিগবেন তো অন্যটা মনুমেন্টের মতো, পাখী ফুলের আকার তো আছেই।
হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ফ্রক পরে, লম্বা বিনুনি দুলিয়ে পাড়ার তিন ষোড়শী বান্ধবী রিনি-বিনি-টিনি আসলো মেলায় -- পান-বিড়ির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মেলা থেকেই কেনা সেঁকা ভুট্টা খাচ্ছিলো আটাপাড়ার উঠতি বয়েসের ছেলেটি, ওদের দেখেই পকেটের রঙিন চশমাটা পরে নিলো। তিন বান্ধবী কিনবে নিজেদের জন্য কাঁচের চুড়ি, নেল-পলিশ আর মাথার টিপ, মায়েদের জন্য চাই সাবিত্রী আলতা আর সিঁদুর।
দামিনী পিসীর রুটি বেলার চাকির একটা পা গেছে ভেঙে, কাঠের জিনিসের দোকানে সমানে বিনতি করে চলেছে একটা রুটির চাকী দেবার জন্য, কিন্তু দোকানদার রাজি না -- চাকী নিলে বেলান ও নিতে হবে, কেননা ওটা "যৌথ পণ্য"।
পুতুলের দোকানে খুব ভীড় -- সমস্ত দেব-দেবী, নভোচর উভচর জলচর সব রকমের প্রাণী ছাড়াও আছে নেতাজী রবীন্দ্রনাথের মূর্তি। বাঙালবাড়ীর ছেলেরা পুতুলের দোকান থেকে দরকারী সব পুতুল কিনে ফিরে যাচ্ছে হাসি ভরা মুখে, কয়েকটা সামান্য ভাঙা মাটির পুতুল দোকানি বিনে পয়সায় দিয়েছে ওদের, তাই বেশি খুশি।
দোকানী দামিনী পিসীকে নিরাশ করেনি, অল্প দামেই একটা চাকী তাকে দিয়েছে, সেটা হাতে নিয়ে প্রফুল্ল মনে পিসী চলেছে বাড়ির পথে।
সন্ধ্যার পরেও হ্যাজাকের আলোয় শিবনাথের মাঠে ছোটরা কাঠের বাঘ ঘোড়ার নাগরদোলায় চড়ছে, একেবারে ছোটরা বড়দের কোলের নির্ভয় আশ্রয়ে বসে খুদে খুদে চোখে দেখছে কাছ থেকে দূরে সরে সরে যাওয়া মানুষদের। পাশেই ঘুগনী কুলফীর স্বাদ নিচ্ছে বড়োরা।
মেলা ভাঙার সময় এগিয়ে এলো -- দোকানীরা গোছাতে শুরু করেছে তাদের সামগ্রী, মাথার ঝাঁকিতে ভরে নিয়ে যাচ্ছে পুতুল খেলনা মঠ কাঁচের চুড়ী। আবার আসবে শ্রাবণ, বসবে মেলা, রাস্তা মাঠ আবার বাঁশি ভেঁপু ডুগডুগীতে সরগরম হবে। অনেক বছর পরে মেলায় আসলে আর দেখা যাবে না সেই তিন ষোড়শীকে, অন্য কোনো দামিনী পিসী আসবে তার রান্না ঘরের জিনিস কিনতে, আটাপাড়ার সেই নতুন যুবকও ব্যস্ত হয়ে পড়বে জীবনের সংঘর্ষে। পাত্রপাত্রী বদলাবে, সাথে মেলার চরিত্রও।

Sunday, June 9, 2019

বরানগর বাজার (১৯৬০/৬৫ 'র গল্প)

বরানগর বাজার .... (১)

কাকডাকা ভোরে বরানগর যখন আলমোড়া ভেঙে শেষ ঘুমটাও চোখে নিংড়ে নিচ্ছে, রাস্তা যানবাহনহীন, সব আলোও নেভেনি, তখন বরানগর বাজারের মুখে ব্যাপারীদের প্রাত্যহিক কর্মব্যস্ততা। মাটিতে বসে খবরের কাগজের হকাররা কাগজের বান্ডিল বানিয়ে সাইকেলে বাঁধছে বিলি করতে যাবে বলে, ট্রাক/ ভ্যান/রিকশা থেকে নামানো হচ্ছে বাজারের শাকসব্জী মাছ, এরই মাঝে ম্যুনিসিপালিটির সাফাই কর্মচারী মোটা ঝাঁটা নিয়ে জঞ্জাল পরিষ্কারে ব্যস্ত। নানান বাহারী ফল সবজীর লাল-সবুজের খেলা চলছে বাজারের ঢোকার মুখে। সামনের জমিতে জল ছিটিয়ে ফুলের দোকানের ব্যাপারী মাটিতে চট পেতে সাজাচ্ছে ফুল বেলপাতা তুলসীপাতার পশরা, তার বৌ বানাচ্ছে মালা, লাল জবা আর গাঁধা ফুল দিয়ে। উনুনের নিচে সমানে হাত পাখা নেড়ে চলেছে চায়ের দোকানের লোক, ঘুঁটে-কয়লার ধুঁয়ায় বাতাস ভারী হয়েছে -- দু'একজন ইতিমধ্যেই তাগাদা দিয়ে গেছে চায়ের জন্য। আওয়াজ করে ঠিক মোড়ের মাথার স্টেশনারী দোকানের ঝাঁপ খুললো আর প্রায় সেই সাথেই ভ্যানে আসলো মাখন পাঁউরুটির ডেলিভারী, মন্দিরের ঘন্টা বাজিয়ে শুরু হলো প্ৰাতঃপ্রণাম। মিষ্টির দোকানের বাইরে টুলে বসে সদ্য নামানো সিদ্ধ আলুর গরম খোসা ছাড়াচ্ছে এক কর্মচারী, নিচে পরে এক রাস কড়াইশুঁটির খোসা -- সিঙ্গারা বানানোর প্রস্তুতি চলছে। দোকান সাজাতে গিয়ে ডিমের দোকানীর হাত থেকে মাটিতে ভেঙে পড়লো ২-৩'টা ডিম, রাস্তার কুকুর সেটা চাটতে আসতেই তার টায়ারের চপ্পল দিয়ে তার ওপর সব রাগ উজাড় করলো দোকানী, বাজারের চালের ওপর থেকে সে দৃশ্য দেখলো লেজ গুটিয়ে বসে থাকা লাল-সাদা মিনি। বগলে আজকের খবরের কাগজ গুঁজে ষ্টেশনারী দোকানে আসলো এক খদ্দের -- ঠান্ডা মাটির জলের পাত্রে রাখা মাখনের ১৫০/২০০ গ্রামের ছোট ছোট প্যাকেট, আঙ্গুল ডুবিয়ে ২টা মাখনের প্যাকেট নিল, নাকে পাঁউরুটির ঘ্রান নিয়ে তাজা ভাব পরীক্ষা করে এক প্যাকেট পাঁউরুটি কিনে পয়সা দিয়ে চলে গেলো। মাটির ভাঁড়ে চা আর তার সাথে S-বিস্কুট খেয়ে কাগজের হকাররা যে যার রুটে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লো। রিকসায় আসলো ছোট মাছ, বড় বড় ড্রামে জল নাড়িয়ে মাছ তাজা রাখছে ব্যাপারী, এক এক করে নিয়ে যাওয়া হবে মেছুয়াদের লাইনে। দিনের আলো তেজ হবার আগেই বরানগর বাজার তৈরী খদ্দেরদের অভ্যর্থনার জন্য -- সারাদিন চলবে দর কষাকষি, লাভ-লোকসানের লড়াই। চৌমাথার ভাড়া বাড়িতে থাকা কাবুলিওয়ালারা কাঁধে ঝোলাভর্তি আখরোট পেস্তা নিয়ে বেরিয়ে পড়লো তাদের জীবিকার সন্ধানে। আর তখনি নরেন্দ্রনাথের পড়ুয়ারা অলিগলি থেকে বেরিয়ে পড়লো সকালের কোচিং ক্লাস করতে।

বরানগর বাজার .... (২)

বেলা আটটা। গড়িয়ে গড়িয়ে বনহুগলী থেকে এসে পৌঁছলো ৩২ নম্বর বাস, সামান্য কয়েকজন যাত্রী। কোনো জলদিবাজী নেই -- অল্পক্ষণের জন্য বাস থামিয়ে ড্রাইভার মা কালীর ফটোর সামনে একটা ধুপকাঠি জ্বালিয়ে পেন্নাম করলো। হাতের টিকেটের বান্ডিলে আঙ্গুল ঘষে কন্ডাক্টর একটা বিচিত্র আওয়াজ করে হাঁক মারলো, যদি ওঠার জন্য কোনো যাত্রী থাকে। তখনো সময় হয়নি যাত্রী আসার, অগত্যা বাস কালো পাথরের ইঁটে সাজানো কাশীপুরের রাস্তায় এগিয়ে গেলো, অসমতল সেই রাস্তায় দরজা জানালার ঝাঁকানিতে খোল কীর্তনের আওয়াজ তুলে। ড্রাইভার মাঝে মাঝে আরশিতে দেখে নিচ্ছে পেছনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ৪ নম্বর বাস আছে কি না।
লুঙ্গি পাজামা পরে লোকেরা আসছে বাজার করতে। হাতে আনাজ আমিষ ও বিবিধ উপকরণের জন্য ২-৩ টা ছোট বড় ব্যাগ, অনেকদিন না ধোয়ার জন্য তাদের আসল রং বোঝা যাবে না। সময় কম, তাড়াতাড়ি বাজার ফেরত হলেই গিন্নীরা ভাত-ডাল-মাছের ঝোলের সংক্ষিপ্ত ব্যঞ্জন বানিয়ে দিতে পারবে, কোনো মতে মুখে দুটি গুঁজেই কর্তারা দৌড়োবে অফিসমুখো, হয় বি.টি.রোড বা বরানগর বাজার থেকে বাস ধরে, তার পেছনে কিছু পরেই বেরোবে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা।
বাজারের বাঁ দিকের গলির মুখের মিষ্টির দোকানে গরম সিঙ্গারা-নিমকির বিক্রী হচ্ছে, মালিক ঘাড়ের গামছা দিয়ে বেলের মোরোব্বার ওপর থেকে মাছি তাড়াচ্ছেন, কর্মচারীকে তাগাদা দিচ্ছেন তাড়াতাড়ি লেনদেন করার জন্য। সেটা পেরোলেই ছোট দোকানে ঠাসা মুড়ি গুড় বাতাসা নলেনগুড়ের মোয়া ইত্যাদির সামগ্রী। পাশেই দাঁড়িয়ে একজন বিক্রি করছে ধূপকাঠি, একটা নমুনা জ্বালিয়ে, খুব সুগন্ধী। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর সকালে তাদের ওপর নজর নেই বাবুদের। এখান থেকে শুরু কাঁচা বাজারের -- মাটিতে চট কাপড় বিছিয়ে একের পর এক ছোট ছোট ব্যাপারীরা নিয়ে বসে আছে নানান সবুজ শাক -- কুমড়া পালং নটে মেথী পুইঁ পলতা, আছে কুমড়া ঢ্যাঁড়স পটল লাউ উচ্ছে বেগুন পটল। কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে এক বৌ বসেছে কাগজীলেবু শশা তালশাঁস পেয়ারা নিয়ে, তার পাশেই এক বুড়ীমা বসেছে মোচা আর কিছু কামরাঙ্গা নিয়ে। বাজারের ভিতরে আছে আলু পেঁয়াজ মাছ মাংসের দোকান, আছে মশলা ও চাল ডাল তেলের দোকান। এর মধ্যেই লোকের গা এড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেটলী হাতে চায়ের দোকানের ছেলেটা, তার অন্য হাতে কয়েকটা মাটির ভাঁড়। ওখান থেকে বেরিয়ে আসলেই আবার বড় রাস্তা -- ডিম ফুল বেলপাতা ওখানে পাবেন।
বাবুরা তাড়াহুড়ায় বেশি দরদাম করতে পারছে না, বড় জোর পাল্লায় একটা বেশি আলু বা পেঁয়াজ, কোথাও আকারে বড় কিছূ নিয়ে জেতার ভাব করছে।
রাস্তার ওপারে রিকশা থেকে কেতাদুরস্ত সাদা পাজামা পাঞ্জাবী, পায়ে রাধুর শৌখিন চপ্পল পরে নামলেন হিরন্ময় বাবু -- বহুদিন বিদেশে থেকে শেষ জীবনে দেশে ফিরেছেন বছর দুই আগে। আজ ড্রাইভার আসেনি, তাই রিকশা। টুংটাং আওয়াজ তুলে লাইটার দিয়ে জ্বালালেন ক্যাপস্টান সিগারেট, রিকশাঅলাকে অপেক্ষা করতে বললেন। বাজারের গলিতে এক পা রেখেই জল কাদা দেখে পিছিয়ে গেলেন -- ইশারাতে বাঁধা মাংসের দোকানীকে ডাকতেই সে দৌড়ে এলো -- "২ সের পাঁঠার মাংস আর একটা মাঝারী ওজনের দেশী মুরগীর মাংস বাড়ীতে বৌদিকে দিয়ে আসিস, বেশি দেরী করিস না"। দামী চামড়ার পার্স থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, "বাকি টাকাটা তোর কাছেই জমা রেখে দিস", বলেই রিকশায় চড়ে ফেরত গেলেন।
রতনবাবু রোডের অনুপমবাবুর বাড়ীতে বাজার করা নিয়ে নিত্যি অশান্তি, প্রায় রোজই খারাপ মেজাজেই বাড়ী থেকে অফিসে যায়, গিন্নী বলে, "কি রোজ রোজ ওই এক ঘেয়ে থানকুনী-কাঁচাকলা আর চারা পোনা আনো, বাড়িতে সবারই কি পেটের ব্যামো আছে?" অনুপমও দমবার পাত্র নয়, জবাব তৈরী "শশুর বাড়ীতেই বা আমার পাতে কোন গলদা চিংড়ি আর পাকা রুইয়ের পেটী পড়ে ?" আজ বেচারা অনুপম ঠিক করেছে পনীর কিনবে, বৌ সত্যি খুব ভালো বানায় পনীর, ঘি গরম মশলা দিয়ে।
সচ্চাসী পাড়ার ধীলনবাবু রোজের মতো আজও ব্যাজার মুখে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে থাকা ২-৩টা বড় থলী নিয়ে বাজারে ঢুকলেন। তিন চাকুরে ভাইয়ের যৌথ পরিবারের বড় ছেলে উনি, বাবা মা তিন ভাইয়ের বৌ বাচ্চা ও কাজের লোক মিলিয়ে প্রায় জনা পনেরোর পরিবার, তিন ভাইই চাকুরে, আর্থিক অবস্থা বেশ ভালোই। এহেন ধীলনবাবুর পীড়া অন্যত্র -- ঠিক বাজারের সময় হলেই ভাইয়েরা বাথরুমে ঢুকে পড়বে, কাপড় ইস্ত্রি করবে বা অন্য কোনো অছিলায় পাড়ার দোকানে "এই আসছি" বলে বেপাত্তা হবে, ফলে বাজারের ঝামেলা এই ধীলনের ঘাড়েই পড়ে -- রোজ আলু পেঁজায় ২-৩টা বড় কফি মাছ -- এই সব দুই হাতে মুটের টেনে টেনে তাকেই আনতে হয়। তবে বাজারে ওনার হিতৈষী অনেক, "এই আড় মাছের পীসটা বাবু আপনার জন্য, ওটার দাম দিতে হবে না", মাছের দোকানী ওনার ব্যাগে আলাদা করে একটা ছোট মাছের ঢুকিয়ে দিয়ে বললো।
নবীন ডাক্তার মনোজিৎ, খুব স্বাস্থ্য সচেতন -- লাল মাংস ? নৈব নৈব চ -- মাছের কানকো উঠিয়ে দর্শনে সন্তুষ্ট হলেই সে মাছ কিনবে, সবুজ সব্জী গাজর-বীটের স্যালাড অনিবার্যভাবে খাবার টেবিলে চাই -- বাজার ঘুরে ঘুরে সে কলেজের নিউট্রিশনের চ্যাপ্টারে উল্লেখ করা কাঁচা ফলসব্জীর যা কিছু এই বাজারে পাওয়া যায় সে সব অল্প অল্প করে কিনলো।
প্রভাকর সদ্য পাশ করে চাকরীতে ঢুকেছে, তাই তারাতাড়ি বাজারে আসে যাতে অফিস যেতে একটুও দেরী না হয় -- মা নাকি ওর বিয়ের পাত্রী দেখেছে কিন্তু লজ্জায় এই ব্যাপারে মা'কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারেনি, সর্বক্ষণ কৌতূহল মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাজার শেষে হাতের ঘড়িতে দেখলো এখনো সময় আছে, মন্দিরের পাশে তেলেভাজার দোকানে বেগুনীতে এক কামড় দিতেই মনে পড়লো আজ বৃহস্পতিবার, লক্ষ্মীপূজার দিন -- বিয়ের ভাবনা ছেড়ে দৌড়োলো আবার সেই শেষের গলিতে পূজার ফুল বেলপাতা আমের পল্লব আর মিষ্টির দোকান থেকে গুজিয়া কিনতে।
শুভ্রকান্তিকে ওজনে বা দামে ঠকাবে, বাজারে এমন দোকানী হাতে গোনা যায়। কর্মসূত্রে তাকে প্রায়ই দিল্লি বোম্বাই করতে হয়, দুনিয়া দেখা লোক সে, তার নজরে কোথাও খুঁত ধরা পড়লে সে তৎক্ষণাৎ ফেরত দেবে -- কানা বেগুন, বুড়ো কাঁচকলা, পোস্তোয় পোকা --কিছুই তার নজর এড়াতে পারে না। মাছের দোকানে ওজন করার আগে পাল্লা উল্টে দেখেন চুম্বক লাগানো আছে কি না, এমনই কঠিন খদ্দের উনি। মাছওয়ালাও তেমনি, দূর থেকে ওনাকে আসতে দেখলেই চালানের রুই মাছের পেটীর ওপর টাটকা মাছের রক্ত মাখিয়ে সেটা শুভ্রকান্তিকেই গছিয়ে দেয় -- "খুব ভালো মাছ, খেয়ে দাম দেবেন বাবু "।
এই ভাবেই তাড়াহুড়ায় শেষ হলো অফিসবাবুদের সকালের বাজার -- বাজারের থলে রান্নাঘরের দুয়ারে ফেলেই দৌড়াবে স্নান করতে, হাপুস হুপুস আওয়াজ তুলে গরম ডাল ভাত তরকারী মাছের ঝোল কোনমতে মতে খেয়েই দৌড়োবে বাস ধরতে, আর দিনের শেষে নেতিয়ে পড়া নটে শাকের মতো ঘর্মক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরবে, দিনযাপনের গ্লানিতে আকণ্ঠ ভরিয়ে।