গাড়ীর নাম মাহাত্ম
Sunday, September 12, 2021
গাড়ীর নাম মাহাত্ম
Tuesday, August 24, 2021
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (৩)
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (৩)
একবার উদয়পুরে ঠাইঁ নিয়েছেন তো একটা বড় সুবিধা হলো, আসেপাশের ভ্রমণের জায়গাগুলো দেখার জন্য সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যায় ফেরা যায় বিনা ক্লান্তিতে। যেমন একশো কিলোমিটারের সামান্য বেশি দূরত্বের চিত্তোরগড়, হাইওয়ে এতই মসৃন ও বাধাহীন যে মনে হবে কোনো বিমানবন্দরের রানওয়ে। চিত্তোর যাবার আগে তার ব্যাপারে একটু পড়াশোনা করে নিলে ভালো হয়, যদিও দেখবেন স্থানীয় গাইডরা মাছির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। অষ্টম শতাব্দীর এই রাজপূত রাজধানী ভারতের সব চাইতে বড় দুর্গ ছিল। সারা চিত্তোরগড় আপনি গাড়ি নিয়ে ঘুরতে পারবেন, এক রাস্তায় প্রবেশ ও অন্য রাস্তায় নির্গমন। দেখুন মীরার মহল ও মন্দির, জহরব্রতের জায়গা, নানান মন্দির, পদ্মিনীর মহল ও জলাশয় (এবার গিয়ে দেখলাম সেই আয়নাটা গায়েব, যাতে পদ্মিনীর প্রতিচ্ছবি দেখে আলাউদ্দীন এক নম্বর কমান্ডমেন্ট ভঙ্গ করেছিল) - - ফেরার পথে অবশ্যই কিছুটা সময় দেবেন "সুরজপোল"-এ, আক্রমণকারী দিল্লীর মালিকেরা(আফগান ও মুঘল) এই পথেই ঢুকতো দুর্গ জয় করার জন্য, প্রতি অধ্যায়ের শেষ হতো জহরব্রত দিয়ে।
উদয়পুর থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে আছে "রাজসামান্দ লেক". শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার এগোলেই পড়বে এক অভয়ারণ্য, ঘন জঙ্গলে দুপাশ ঢাকা, আড়াল থেকে তীক্ষ্ণস্বরে ডেকে পাখার ঝাপ্টা মেরে পালিয়ে গেলো নাম না জানা পাখী, কোথাও জলাশয়ের পাড়ে এক চক্ষু বুজে দাঁড়িয়ে আছে ঢ্যাঙা এক ভিনদেশী বক, নির্জন নিঃসঙ্গ আলোআঁধারী পরিবেশ। কিছুক্ষন পরেই আসবে "রাজসামান্দ লেক", পাহাড়ের কোলে ছড়ানো -- এক সুন্দর শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে যাকে ছবির মতো দেখায়। সতেরোশ শতকে মেবারের রানা রাজসিং নির্মাণ করেছিলেন এই লেক। সুন্দর শ্বেতপাথরে বাঁধানো ঘাটে বসে দেখুন চারপাশের ছবি, কাঁচের মতো টলটল পরিষ্কার জলে দেখুন ভেসে যাওয়া মেঘের ছায়া আর থেকে থেকে জল থেকে ছলাঙ মারা রুপালী মাছেদের হুটোপুটি।
হালদিঘাট যুদ্ধের পরেও দুই দশক বেঁচে ছিলেন প্রতাপ, নতুন রাজধানী বানিয়েছিলেন উদয়পুর থেকে ৬৫
কিলোমিটার দূরে, চাভান্ড গ্রামে,
রাজসামান্দ থেকে ৩০
কিলোমিটারের মতো দূরে, সরু রাস্তা ধরে
ছোট ছোট গ্রামের মধ্যে দিয়ে গাড়ির রাস্তা। চাভান্ড থেকে দুই কিলোমিটার দূরে,
বাডোলি গ্রামে, এক নদীর পাড়ে প্রতাপের শেষকৃত্য করা হয়। লোকালয়
থেকে অনেক দূরে থাকা এই সমাধিতে কিছুক্ষন সময় কাটান, সেই পরাক্রমী রাজপুতের স্মরণে। এই জায়গা সাধারণ পর্যটকদের জানার বাইরে,
কোনোদিন উদয়পুর আসলে
অবশ্যই খোঁজ নেবেন।
সাতদিনের প্রোগ্রাম শেষ, ঘরে ফেরার সময়
এলো -- সকালে হোটেলে প্রাতঃরাশ সেরে রওনা দেওয়া আহমেদাবাদের রাষ্ট্রীয় সড়ক মার্গে,
রাস্তায় কেনা হলো বার্গার
ব্রেড চীজ বিস্কুট ইত্যাদি, সাথে আছে
ফ্লাস্কের গরম জল আর টি-ব্যাগ। অনেক ভালো জায়গা পাবেন রাস্তায় জিরোবার জন্য,
এখন তো আর তাড়া নেই.ঘরে
ফেরার। গান্ধীনগর ঢুকতেই পড়ন্ত বিকেলে, আর ২০ কিলোমিটার পরেই আহমেদাবাদ।
মাথায় এখন আছে হয় জয়সলমীর (৩ দিন যথেষ্ট) নয়তো ধোলাভিরা (হরাপ্পা সংস্কৃতির
অবশেষ, বিরাট বৃষ্টির জল ধরে
রাখা কুয়া ইত্যাদি) ছুঁয়ে কচ্ছ সীমান্ত আদি ঘুরে আসা (৪/৫ দিন ধরে রাখুন) --
নয়তো ইন্দোর-বিদিশা-সাগর- এলাহাবাদ-হাজারীবাগ-কলকাতা-আহমেদাবাদের (এটা প্রায় ২২০০
কিলোমিটার, সব মিলিয়ে দিন কুড়ির
ভ্রমণ।
Wednesday, August 18, 2021
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (২)
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (২)
Sunday, August 8, 2021
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (১)
কুহেলী আরাবল্লীর হাতছানি (১)
(Internet-এ এই বিষয়ে অনেক
ছবি ও ভিডিও থাকায়, এই লেখাতে আমার
ব্যক্তিগত সংগ্রহ পরিহার করেছি -- অনেক বেশি ভ্রমণ
বিবরণও পাবেন সার্চ করলে)
COVID -এর বাধানিষেধ
অসহ্য হলেই মেয়ে আর নাতি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম আরাবল্লীর আশ্রয়ে। একবার না, একাধিকবার। আমেদাবাদ থেকে আরবল্লী আপনি ৭-৮
ঘন্টায় ছুঁয়ে ফিরে আসতে পারেন (শ্যামলাজী,
পোলো'র জঙ্গল বা তরঙ্গা পাহাড় ), কমবেশি ১৫০ কিলোমিটার। সময় থাকলে সীমানা পেরিয়ে রাজস্থানে দিনও কাটাতে
পারেন (আবু পাহাড়, উদয়পুর, কুম্বলগড়, হালদিঘাটি বা রাজসমুদ্র'লেক), কমবেশী ৩০০ কিলোমিটারের দূরত্ব। গুজরাট ও রাজস্থানের সব রাস্তাই মসৃণ চওড়া,
সড়কপথে যাত্রা
যন্ত্রণাদায়ক না, রাস্তার পাশে আছে
অনেক উত্তম ধাবা, যার খাবার ও স্বচ্ছ
পরিবেশ সপরিবারে ভ্রমণের উপযুক্ত।যাতায়াতের অন্য সাধারণ ব্যবস্থা থাকলেও, নির্ঝঞ্ঝাট হয় নিজেদের গাড়ি থাকলে।
সেই হরিয়ানা থেকে
প্রায় ৭০০ কিলোমিটার পথ হেঁটে, দিল্লী রাজস্থান
হয়ে, গুজরাটের আবু’তে যাত্রা শেষ করেছে আরাবল্লী, হিমালয়ের থেকেও যার বয়েস বেশি। তার কাঁটা ঝোপ
ঝাড় জঙ্গলে আশ্রয় দিয়েছে
হরপ্পা সভ্যতার বিস্তার, অনেক অনেক বৌদ্ধ
গুফায় গুঞ্জিত হয়েছে মানুষ ও জীবের মঙ্গল কামনার প্রার্থনা, হিন্দু ও জৈন মন্দির তো আছেই। তার কোনে কোনে
এখনো লুকানো অদেখা অজানা অতীতের অনেক অনাবিষ্কৃত রহস্য, ঘন কাঁটাভরা বাবুলের আঁচলে যা চোখের আড়ালে ঢাকা রয়েছে। এই আরাবল্লী আবার
বর্ষার ছোঁয়ায় সবুজে সেজে ওঠে, অতি অপরূপা তখন
সে -- তার গা বেয়ে নেমে আসে ছোট বড় বর্ষাতি নদী, পাদদেশের শুষ্ক নিঃস্নেহ ঊষর প্রান্তরে
শ্যামলীমা আনতে।
শ্যামলাজী’র মন্দির। এই মন্দিরে গদাধর বিষ্ণু আনুমানিক হাজার বছর বিরাজমান,
মন্দিরের বাইরের দেয়ালের
কারুকাজ দেখে অবাক হবেন, এমন সুন্দর। এর
পরেই রাজস্থানের চেকপোস্ট, রাস্তা গেছে
উদয়পুরের দিকে। সময় থাকলে খোঁজ করুন আশেপাশের প্রাচীন বৌদ্ধ মঠের -- একটার খোঁজ
পেয়েছিলাম, কিন্ত বিবরণে অতি দুর্গম
জেনে দেখা হয় নি।
পোলো'র জঙ্গল। প্রায় এক হাজার
বছরের আগে পরিহার বংশের রাজা এখানে তার রাজধানী বানিয়ে ছিলেন, হার্নাভ নদীর পাশে, ৪০০বর্গ কিলোমিটার ছড়ানো এই গুজরাট-রাজস্থান
সীমান্তের ঘন জঙ্গলে - - বলা হতো, এখানে মাটিতে
সূর্যেরআলো পৌঁছায় না, এমনই ছিল সবুজের
আস্তরণ। পরিত্যক্ত এই শহরে আছে খুব সুন্দর প্রাচীন শিব মন্দির, জৈন মন্দির। জঙ্গলে কান পেতে শুনুন হর্নবিল বা
বার্বেটের কণ্ঠস্বর, রাত্রে চিতা
ভালুক হায়েনা তাদের উপস্থিতি জানায়।
তরঙ্গা পাহাড়। আরাবল্লীর এক বিস্তার এই পাহাড় ভিন প্রদেশের পর্যটকদের কাছে খুব পরিচিত না, বেশখানিটা নির্জন রাস্তা পেরিয়ে পৌঁছতে হয়, তারপরেই সেই কাছে আসার হাতছানি। পাহাড়ী রাস্তার দুপাশে ঘন জঙ্গল, এক পাস দিয়ে এক ক্ষীণতনু এক স্রোতস্বিনী নিজের তালে নেমে আসছে। উঁটের পিঠের মতো উতরাও-চড়াও পথের শেষে মিলবে জৈনদের এক প্রসিদ্ধ মন্দির। ফিরে যান সমতলে, একটু এগিয়েই পাবেন পুরানো বৌদ্ধ গুফা, সরকারী প্রকল্পে যার সংস্কার চলছে। উঁচুতে পাহাড়ের ওপরে আছে আরও এক বৌদ্ধ সাধনা স্থল, জঙ্গলে ঢেকে গেছে সেখানে পৌঁছানোর পথ।
এই হলো পাহাড়ের
একপাশের গল্প, গুজরাটের। ও পাশের গল্প
করবো পরের বার।
Thursday, October 31, 2019
প্রায় লুপ্ত হওয়া কিছু জীবিকার কথা -- সিঁথী, ১৯৫০-৬৫
Wednesday, October 30, 2019
সিঁথীর শ্রাবনের মেলা
সেই ১৯৫৫-৬৫'এর কথা। দুর্গাপূজা কালীপূজার মতোই রথযাত্রা ঝুলন শৈশবে অপেক্ষায় থাকা ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল, যদিও সময় ও সামাজিক পরিবর্তনের সাথে সাথে তারা মহত্ব খুইয়েছে। জনজীবন তার সারল্য হারিয়েছে, শৈশব বঞ্চিত হয়েছে সামূহিক উৎসবে ভাগিদারীর আনন্দ থেকে।
শ্রাবন আসলেই বসতো মেলা। শহরতলী সিঁথীর নানান পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বসতো সেই মেলা, বরানগরে তেমন কিছু হতো বলে মনে পড়ে না। কালীতলায় আমার মহল্লায়ও একদিনের মেলা বসতো -- বাসস্ট্যান্ড আর শিবনাথ ক্লাবের এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্রায় ৫০০ মিটার জুড়ে বসতো সেই শোরগোলের মেলা, দুপুর থেকে সন্ধ্যা গড়ানোর পরেও চলতো বেচাকেনার ভীড়।
কালীতলার বাঙালবাড়ীর ছেলেৱা লিস্ট বানিয়ে ফেলেছে ঝুলনযাত্রার প্রদর্শনী সাজানোর জন্য কি কি জিনিস কিনতে হবে -- পাহাড়ের ওপরে বসবেন মহাদেব ঠাকুর, পেছনের বালতির জল সাইফন হয়ে তাঁর মাথার ওপর থেকে মন্দাকিনী বইবে, জঙ্গলে থাকবে বাঘ সিংহ হরিণ, গাছে বসবে রঙীন পাখী, লাল মাটির পথ বেয়ে সমতলে থাকবে একটা মন্দির আর সরোবর, যার জলে আওয়াজ তুলে ঘুরবে একটা নৌকা (কার্বাইড না কেরোশিনে, মনে নেই) -- কাঁখে কলস নিয়ে জল তুলতে আসবে গ্রামের বৌ, সাথে তার বাছা। কাদা মাটি ইঁট ছেঁড়া কাপড় দিয়ে ১০x ১০-এর মণ্ডপ সাজানো হয়ে গেছে, চাঁদা তোলাও শেষ, এখন শ্রাবনের মেলা থেকে পুতুল কেনার অপেক্ষা।
ঢোকার মুখেই বিক্রী হচ্ছে নানান রঙের বেলুন, ছোট বড় তো আছেই, আছে বেলুনের ঝুমঝুমি, আছে বেলুন দিয়ে বানানো লম্বা লেজের বাঁদর পাখী সাপ, গ্যাস বেলুনের জায়গা ঘিরে কচিদের ভীড়। কাগজে বানানো কুমীর তার লেজ হেলিয়ে, পিঠে ঢেউ তুলে গড়গড় করে চলেছে সুতোর টানে আর ভয়ে দু'পা পিছোচ্ছে বাচ্চারা।
তার সাথে পাল্লা দিয়ে গড়িয়ে চলছে ঢাকের বাদ্যি -- গোল মাটির পাত্রের ওপর চামড়া লাগানো, সুতো-কাঠি দিয়ে এমন কৌশলে বানানো যে চাকা গড়ালেই কাঠি পড়বে চামড়ায় আর বাজবে বাদ্যি।
হটাৎ কোথা থেকে সামনে থেকে আসলো ছোবল তোলা সাপ -- বাঁশের সরু কঞ্চি দিয়ে ভাঁজ করে বানানো ফ্রেম, লেজের দিকে চাপ দিলেই ফ্রেম লম্বা হবে আর সাপের মাথা তেড়ে আসবে অসতর্কের দিকে। এর কাছেই পাবেন কাঠিতে স্প্রিং লাগানো বানর, ওপর থেকে নামছে কেঁপে কেঁপে।
পাশেই বিক্রি হচ্ছে সেই জলে চলা নৌকা, সাথে পাবেন এমন এক টিনের ব্যাঙ যার পেট টিপলেই আওয়াজ বেরোবে। এই আওয়াজ করা ব্যাঙ একবার নৈনান পাড়ার সহপাঠী শ্রীমান স্বরাজ সাহা স্কুলে এনে খুব বকুনি খেয়ে ছিল।
সব আওয়াজ ছাপিয়ে এর মাঝে চীৎকার কেঁদে উঠলো এক বাচ্চা -- গেলো গেলো রব শেষ না হতেই তার হাতের গ্যাস বেলুন আকাশপাড়ি দিয়েছে দমদম রেল লাইনের দিকে, বাচ্চাকে থামাতে আবার উল্টোমুখী হলো তার মা-বাবা, সেই গ্যাস বেলুনের জায়গায়। এক কান্না না থামতেই আর এক কান্না -- কাঠি থেকে আধখানা খসে পড়েছে এক খুকুর হাতের কমলা রঙের আইসক্রিম, ফের দৌড়াও সেই "ম্যাগনোলিয়া" ঠেলার কাছে, কেনো আর একটা। ততক্ষনে তার পাশেই এসে দাঁড়িয়েছে "বুড়ীর মাথার পাকাচুল" আর আঠার মতো এক ক্যান্ডি, বড় বাঁশের ওপরে লাগানো একটা কি যেন মাখা থেকে ছোট বাঁশের স্টিকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে নানান ফুলের আকার করে বিক্রি করছে -- ললিপপের মতো ওটাকে চেটে চেটে খেতে হয়।
ছাতি খুলে বসেছে একজন মঠ ফুটকরাই সিগাটের-লজেন্স নিয়ে -- ভরসা নেই আকাশের, যদি বৃষ্টিতে চিনির জিনিস নষ্ট হয়ে যায়`! মঠের বাহার দেখো -- একটা বিগবেন তো অন্যটা মনুমেন্টের মতো, পাখী ফুলের আকার তো আছেই।
হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ফ্রক পরে, লম্বা বিনুনি দুলিয়ে পাড়ার তিন ষোড়শী বান্ধবী রিনি-বিনি-টিনি আসলো মেলায় -- পান-বিড়ির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মেলা থেকেই কেনা সেঁকা ভুট্টা খাচ্ছিলো আটাপাড়ার উঠতি বয়েসের ছেলেটি, ওদের দেখেই পকেটের রঙিন চশমাটা পরে নিলো। তিন বান্ধবী কিনবে নিজেদের জন্য কাঁচের চুড়ি, নেল-পলিশ আর মাথার টিপ, মায়েদের জন্য চাই সাবিত্রী আলতা আর সিঁদুর।
দামিনী পিসীর রুটি বেলার চাকির একটা পা গেছে ভেঙে, কাঠের জিনিসের দোকানে সমানে বিনতি করে চলেছে একটা রুটির চাকী দেবার জন্য, কিন্তু দোকানদার রাজি না -- চাকী নিলে বেলান ও নিতে হবে, কেননা ওটা "যৌথ পণ্য"।
পুতুলের দোকানে খুব ভীড় -- সমস্ত দেব-দেবী, নভোচর উভচর জলচর সব রকমের প্রাণী ছাড়াও আছে নেতাজী রবীন্দ্রনাথের মূর্তি। বাঙালবাড়ীর ছেলেরা পুতুলের দোকান থেকে দরকারী সব পুতুল কিনে ফিরে যাচ্ছে হাসি ভরা মুখে, কয়েকটা সামান্য ভাঙা মাটির পুতুল দোকানি বিনে পয়সায় দিয়েছে ওদের, তাই বেশি খুশি।
দোকানী দামিনী পিসীকে নিরাশ করেনি, অল্প দামেই একটা চাকী তাকে দিয়েছে, সেটা হাতে নিয়ে প্রফুল্ল মনে পিসী চলেছে বাড়ির পথে।
সন্ধ্যার পরেও হ্যাজাকের আলোয় শিবনাথের মাঠে ছোটরা কাঠের বাঘ ঘোড়ার নাগরদোলায় চড়ছে, একেবারে ছোটরা বড়দের কোলের নির্ভয় আশ্রয়ে বসে খুদে খুদে চোখে দেখছে কাছ থেকে দূরে সরে সরে যাওয়া মানুষদের। পাশেই ঘুগনী কুলফীর স্বাদ নিচ্ছে বড়োরা।
মেলা ভাঙার সময় এগিয়ে এলো -- দোকানীরা গোছাতে শুরু করেছে তাদের সামগ্রী, মাথার ঝাঁকিতে ভরে নিয়ে যাচ্ছে পুতুল খেলনা মঠ কাঁচের চুড়ী। আবার আসবে শ্রাবণ, বসবে মেলা, রাস্তা মাঠ আবার বাঁশি ভেঁপু ডুগডুগীতে সরগরম হবে। অনেক বছর পরে মেলায় আসলে আর দেখা যাবে না সেই তিন ষোড়শীকে, অন্য কোনো দামিনী পিসী আসবে তার রান্না ঘরের জিনিস কিনতে, আটাপাড়ার সেই নতুন যুবকও ব্যস্ত হয়ে পড়বে জীবনের সংঘর্ষে। পাত্রপাত্রী বদলাবে, সাথে মেলার চরিত্রও।
Sunday, June 9, 2019
বরানগর বাজার (১৯৬০/৬৫ 'র গল্প)
বেলা আটটা। গড়িয়ে গড়িয়ে বনহুগলী থেকে এসে পৌঁছলো ৩২ নম্বর বাস, সামান্য কয়েকজন যাত্রী। কোনো জলদিবাজী নেই -- অল্পক্ষণের জন্য বাস থামিয়ে ড্রাইভার মা কালীর ফটোর সামনে একটা ধুপকাঠি জ্বালিয়ে পেন্নাম করলো। হাতের টিকেটের বান্ডিলে আঙ্গুল ঘষে কন্ডাক্টর একটা বিচিত্র আওয়াজ করে হাঁক মারলো, যদি ওঠার জন্য কোনো যাত্রী থাকে। তখনো সময় হয়নি যাত্রী আসার, অগত্যা বাস কালো পাথরের ইঁটে সাজানো কাশীপুরের রাস্তায় এগিয়ে গেলো, অসমতল সেই রাস্তায় দরজা জানালার ঝাঁকানিতে খোল কীর্তনের আওয়াজ তুলে। ড্রাইভার মাঝে মাঝে আরশিতে দেখে নিচ্ছে পেছনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ৪ নম্বর বাস আছে কি না।
লুঙ্গি পাজামা পরে লোকেরা আসছে বাজার করতে। হাতে আনাজ আমিষ ও বিবিধ উপকরণের জন্য ২-৩ টা ছোট বড় ব্যাগ, অনেকদিন না ধোয়ার জন্য তাদের আসল রং বোঝা যাবে না। সময় কম, তাড়াতাড়ি বাজার ফেরত হলেই গিন্নীরা ভাত-ডাল-মাছের ঝোলের সংক্ষিপ্ত ব্যঞ্জন বানিয়ে দিতে পারবে, কোনো মতে মুখে দুটি গুঁজেই কর্তারা দৌড়োবে অফিসমুখো, হয় বি.টি.রোড বা বরানগর বাজার থেকে বাস ধরে, তার পেছনে কিছু পরেই বেরোবে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা।
বাজারের বাঁ দিকের গলির মুখের মিষ্টির দোকানে গরম সিঙ্গারা-নিমকির বিক্রী হচ্ছে, মালিক ঘাড়ের গামছা দিয়ে বেলের মোরোব্বার ওপর থেকে মাছি তাড়াচ্ছেন, কর্মচারীকে তাগাদা দিচ্ছেন তাড়াতাড়ি লেনদেন করার জন্য। সেটা পেরোলেই ছোট দোকানে ঠাসা মুড়ি গুড় বাতাসা নলেনগুড়ের মোয়া ইত্যাদির সামগ্রী। পাশেই দাঁড়িয়ে একজন বিক্রি করছে ধূপকাঠি, একটা নমুনা জ্বালিয়ে, খুব সুগন্ধী। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর সকালে তাদের ওপর নজর নেই বাবুদের। এখান থেকে শুরু কাঁচা বাজারের -- মাটিতে চট কাপড় বিছিয়ে একের পর এক ছোট ছোট ব্যাপারীরা নিয়ে বসে আছে নানান সবুজ শাক -- কুমড়া পালং নটে মেথী পুইঁ পলতা, আছে কুমড়া ঢ্যাঁড়স পটল লাউ উচ্ছে বেগুন পটল। কোলে ছোট বাচ্চা নিয়ে এক বৌ বসেছে কাগজীলেবু শশা তালশাঁস পেয়ারা নিয়ে, তার পাশেই এক বুড়ীমা বসেছে মোচা আর কিছু কামরাঙ্গা নিয়ে। বাজারের ভিতরে আছে আলু পেঁয়াজ মাছ মাংসের দোকান, আছে মশলা ও চাল ডাল তেলের দোকান। এর মধ্যেই লোকের গা এড়িয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে কেটলী হাতে চায়ের দোকানের ছেলেটা, তার অন্য হাতে কয়েকটা মাটির ভাঁড়। ওখান থেকে বেরিয়ে আসলেই আবার বড় রাস্তা -- ডিম ফুল বেলপাতা ওখানে পাবেন।
বাবুরা তাড়াহুড়ায় বেশি দরদাম করতে পারছে না, বড় জোর পাল্লায় একটা বেশি আলু বা পেঁয়াজ, কোথাও আকারে বড় কিছূ নিয়ে জেতার ভাব করছে।
রাস্তার ওপারে রিকশা থেকে কেতাদুরস্ত সাদা পাজামা পাঞ্জাবী, পায়ে রাধুর শৌখিন চপ্পল পরে নামলেন হিরন্ময় বাবু -- বহুদিন বিদেশে থেকে শেষ জীবনে দেশে ফিরেছেন বছর দুই আগে। আজ ড্রাইভার আসেনি, তাই রিকশা। টুংটাং আওয়াজ তুলে লাইটার দিয়ে জ্বালালেন ক্যাপস্টান সিগারেট, রিকশাঅলাকে অপেক্ষা করতে বললেন। বাজারের গলিতে এক পা রেখেই জল কাদা দেখে পিছিয়ে গেলেন -- ইশারাতে বাঁধা মাংসের দোকানীকে ডাকতেই সে দৌড়ে এলো -- "২ সের পাঁঠার মাংস আর একটা মাঝারী ওজনের দেশী মুরগীর মাংস বাড়ীতে বৌদিকে দিয়ে আসিস, বেশি দেরী করিস না"। দামী চামড়ার পার্স থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, "বাকি টাকাটা তোর কাছেই জমা রেখে দিস", বলেই রিকশায় চড়ে ফেরত গেলেন।
রতনবাবু রোডের অনুপমবাবুর বাড়ীতে বাজার করা নিয়ে নিত্যি অশান্তি, প্রায় রোজই খারাপ মেজাজেই বাড়ী থেকে অফিসে যায়, গিন্নী বলে, "কি রোজ রোজ ওই এক ঘেয়ে থানকুনী-কাঁচাকলা আর চারা পোনা আনো, বাড়িতে সবারই কি পেটের ব্যামো আছে?" অনুপমও দমবার পাত্র নয়, জবাব তৈরী "শশুর বাড়ীতেই বা আমার পাতে কোন গলদা চিংড়ি আর পাকা রুইয়ের পেটী পড়ে ?" আজ বেচারা অনুপম ঠিক করেছে পনীর কিনবে, বৌ সত্যি খুব ভালো বানায় পনীর, ঘি গরম মশলা দিয়ে।
সচ্চাসী পাড়ার ধীলনবাবু রোজের মতো আজও ব্যাজার মুখে হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে থাকা ২-৩টা বড় থলী নিয়ে বাজারে ঢুকলেন। তিন চাকুরে ভাইয়ের যৌথ পরিবারের বড় ছেলে উনি, বাবা মা তিন ভাইয়ের বৌ বাচ্চা ও কাজের লোক মিলিয়ে প্রায় জনা পনেরোর পরিবার, তিন ভাইই চাকুরে, আর্থিক অবস্থা বেশ ভালোই। এহেন ধীলনবাবুর পীড়া অন্যত্র -- ঠিক বাজারের সময় হলেই ভাইয়েরা বাথরুমে ঢুকে পড়বে, কাপড় ইস্ত্রি করবে বা অন্য কোনো অছিলায় পাড়ার দোকানে "এই আসছি" বলে বেপাত্তা হবে, ফলে বাজারের ঝামেলা এই ধীলনের ঘাড়েই পড়ে -- রোজ আলু পেঁজায় ২-৩টা বড় কফি মাছ -- এই সব দুই হাতে মুটের টেনে টেনে তাকেই আনতে হয়। তবে বাজারে ওনার হিতৈষী অনেক, "এই আড় মাছের পীসটা বাবু আপনার জন্য, ওটার দাম দিতে হবে না", মাছের দোকানী ওনার ব্যাগে আলাদা করে একটা ছোট মাছের ঢুকিয়ে দিয়ে বললো।
নবীন ডাক্তার মনোজিৎ, খুব স্বাস্থ্য সচেতন -- লাল মাংস ? নৈব নৈব চ -- মাছের কানকো উঠিয়ে দর্শনে সন্তুষ্ট হলেই সে মাছ কিনবে, সবুজ সব্জী গাজর-বীটের স্যালাড অনিবার্যভাবে খাবার টেবিলে চাই -- বাজার ঘুরে ঘুরে সে কলেজের নিউট্রিশনের চ্যাপ্টারে উল্লেখ করা কাঁচা ফলসব্জীর যা কিছু এই বাজারে পাওয়া যায় সে সব অল্প অল্প করে কিনলো।
প্রভাকর সদ্য পাশ করে চাকরীতে ঢুকেছে, তাই তারাতাড়ি বাজারে আসে যাতে অফিস যেতে একটুও দেরী না হয় -- মা নাকি ওর বিয়ের পাত্রী দেখেছে কিন্তু লজ্জায় এই ব্যাপারে মা'কে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারেনি, সর্বক্ষণ কৌতূহল মাথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাজার শেষে হাতের ঘড়িতে দেখলো এখনো সময় আছে, মন্দিরের পাশে তেলেভাজার দোকানে বেগুনীতে এক কামড় দিতেই মনে পড়লো আজ বৃহস্পতিবার, লক্ষ্মীপূজার দিন -- বিয়ের ভাবনা ছেড়ে দৌড়োলো আবার সেই শেষের গলিতে পূজার ফুল বেলপাতা আমের পল্লব আর মিষ্টির দোকান থেকে গুজিয়া কিনতে।
শুভ্রকান্তিকে ওজনে বা দামে ঠকাবে, বাজারে এমন দোকানী হাতে গোনা যায়। কর্মসূত্রে তাকে প্রায়ই দিল্লি বোম্বাই করতে হয়, দুনিয়া দেখা লোক সে, তার নজরে কোথাও খুঁত ধরা পড়লে সে তৎক্ষণাৎ ফেরত দেবে -- কানা বেগুন, বুড়ো কাঁচকলা, পোস্তোয় পোকা --কিছুই তার নজর এড়াতে পারে না। মাছের দোকানে ওজন করার আগে পাল্লা উল্টে দেখেন চুম্বক লাগানো আছে কি না, এমনই কঠিন খদ্দের উনি। মাছওয়ালাও তেমনি, দূর থেকে ওনাকে আসতে দেখলেই চালানের রুই মাছের পেটীর ওপর টাটকা মাছের রক্ত মাখিয়ে সেটা শুভ্রকান্তিকেই গছিয়ে দেয় -- "খুব ভালো মাছ, খেয়ে দাম দেবেন বাবু "।
এই ভাবেই তাড়াহুড়ায় শেষ হলো অফিসবাবুদের সকালের বাজার -- বাজারের থলে রান্নাঘরের দুয়ারে ফেলেই দৌড়াবে স্নান করতে, হাপুস হুপুস আওয়াজ তুলে গরম ডাল ভাত তরকারী মাছের ঝোল কোনমতে মতে খেয়েই দৌড়োবে বাস ধরতে, আর দিনের শেষে নেতিয়ে পড়া নটে শাকের মতো ঘর্মক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরবে, দিনযাপনের গ্লানিতে আকণ্ঠ ভরিয়ে।